আরবি ভাষা

লেখালেখি বিষয়ে প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক মানফালুতীর কিছু বক্তব্য

লেখালেখি বিষয়ে প্রখ্যাত আরবী সাহিত্যিক মানফালুতীর কিছু বক্তব্য

“যেখানে অন্তরের অন্তঃস্থলে নিবিড় হয়ে থাকা ভাব ও অর্থকে এমন সত্যনিষ্ঠ ও সজীব রূপ দেওয়া হয় যেন পাঠক নিজ চোখে তা প্রত্যক্ষ করছে, নিজ স্পর্শে তার উষ্ণতা অনুভব করছে সাহিত্য সেখানেই।” (নাজারাত: ৩/৬)

“উৎকৃষ্ট ও মানসম্মত লেখার যোগ্যতা ততক্ষণ পোক্ত হবে না যতক্ষণ না শিক্ষার্থী নির্বাচিত গদ্য ও পদ্যের বড় একটা অংশ গভীর মনোযোগ দিয়ে এমনভাবে পড়বে যেন তার সকল অর্থ ও মর্ম হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। তা দূরে থাকলে তার কাছে হেঁটে হেঁটে যাবে, আয়ত্তের বাহিরে থাকলে তাকে আওতাধীন করবে, উঁচুতে থাকলে তার নাগাল পেতে চেষ্টা করবে, গভীর গহীনে থাকলে ভেতরে ঢুকে তাকে আবিষ্কার করবে। কপালের ঘাম ঝরানো এই কঠোর অনুশীলন ততক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে যতক্ষণ না লেখার যোগ্যতা তার স্বাভাবিক স্বভাবে পরিণত হয়।” (মুখতারতুল মানফালুতী: ৭ পৃ.)

কামেল মুহাম্মদ লিখেছেন, মানফালুতীর কাছে সাহিত্যের সবচেয়ে উত্তম সংকলন ছিলো আব্দু রব্বির العقد الفريد, আবুল ফারাজ আসবাহানীর الأغاني ও আবু ইসহাক হুসরীর زهر الآداب। কাব্যের মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে উত্তম ছিলো মুতানাব্বী, বুহতুরী, আবু তাম্মাম ও শরীফ রযীর কবিতা। গদ্যের মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে প্রিয় ছিলো আব্দুল হামীদ, ইবনুল মুকাফফা, ইবনে খালদুন (মুকাদ্দিমা) ও ইবনুল আসীর (সাজা' মুক্ত) এর গদ্য। (মানফালুতী হায়াতুহু ওয়া আদাবুহু: ১/২৯)

মানফালুতী তার নাজারাতের ভূমিকায় লিখেছেন, “অনেকের প্রশ্ন শুনে মনে হয় তারা জানতে চায়, আমি লেখার ক্ষেত্রে কোন পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করি। যাতে তারা‌ও একই পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে। কিন্তু আমি চাই না তারা কারোর পথ অনুসরণ করুক। না আমার, না অন্য কারোর। আমার লেখায় কোনো বিশেষ গুণ যদি থেকেই থাকে যা তাদের চমৎকৃত করে, তা শুধু এই কারণে, আমি অনুকরণের বাধন ভেঙে নিজের পথটি নিজে খুঁজে নিয়েছি।”

এই ভূমিকার শেষে এমন চারটি বিষয়ের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন যেগুলোকে লেখালেখির কাজে তিনি নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। কিছুটা সংক্ষেপ করে সেগুলো উল্লেখ করছি যাতে করে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সাহিত্যচর্চায় তা থেকে উপকৃত হতে পারে:

১. শব্দ ও ভাবের পরিপূর্ণ মিল:
তিনি কখনো এমন শব্দ ব্যবহার করতেন না যা তার ভাব ও মর্মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতো না। এমন ভাব ও অর্থ‌ খোঁজার‌ও কোশেশ করতেন না যার উৎস তার হৃদয় নয়। তিনি মানুষের সাথে মুখে স্বাভাবিক যেভাবে কথা বলতেন তেমন করে‌ই কলমে লিখতেন। তিনি চাইতেন, তার কলম কথা বলুক আর তার পাঠকরা শুনুক।

২. জবরদস্তি ও লৌকিকতা মুক্ত:
তিনি লেখার সময় নিজেকে অতিরিক্ত চাপ দিতেন না। তিনি বলতেন, আমি কখনো টেবিলে বসে ভাবতাম না যে আজ কী লিখব, কোন বিষয়টি অধিক মনোমুগ্ধকর ও হৃদয়গ্রাহী হবে, বা কোন লেখা পাঠকের মনে বেশি ধরবে। আমি যা দেখি তা নিয়ে ভাবি। তারপর লিখে তা প্রকাশ করি। কখনো পাঠককে তা আনন্দ দেয়। কখনো তা রুষ্ট করে। কিন্তু খুশি করা বা রাগান্বিত করা আমার উদ্দেশ্য হয় না।

৩. বাস্তবতা ও কল্পনার সমন্বয়:
তিনি কখনো এমন বাস্তবতা লেখেননি যা কল্পনা ও শৈল্পিকতার মিশেল থেকে মুক্ত হতো। আবার কল্পনার ডানায় এতটা উড়াল দিতেন না যে তা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে সরে যায়। বাস্তবতা ও কল্পনার অপূর্ব মিলন তার লেখায় খুব‌ স্পষ্টভাবে‌ই লক্ষ্য করা যায়।

৪. প্রশংসার জন্য নয়, উপকারের জন্য:
তিনি লিখতেন মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্য নয়, বরং তাদের উপকারের জন্য। পাঠকের প্রশংসা বাণী কখনো তার লক্ষ্য হতো না। তার লেখার প্রভাব পাঠকের জীবনে পড়ুক এটাই হতো চূড়ান্ত লক্ষ্য।

এই পোস্টটি শেয়ার করুন